দোল পূর্ণিমা নিশি নিৰ্ম্মল আকাশ।
ধীরে ধীরে বহিতেছে মলয় বাতাস।।
লক্ষ্মীদেবী বামে করি বসি নারায়ণ।
করিছেন নানা কথা সুখে আলাপন।।
হেনকালে বীণা করে আসি মুনিবর।
নারায়ণের সাক্ষাতে কহিলা বিস্তর।।
তারপর করজোড়ে করিয়া প্রণতি।
কহিল নারদ মুনি নারায়ণী প্রতি।।
কহ মাতঃ! এ কেমন তোমার বিচার।
চঞ্চলা চপলা প্রায় ফির দ্বারে দ্বার।।
পলকের তরে তব নাহি কোথা স্থিতি ।
মর্ত্যবাসী সদা তাই ভুগিছে দুৰ্গতি।।
সতত কুক্রিয়া রত নরনারীগণ।
অসহ্য যাতনা পায় দুর্ভিক্ষ ভীষণ।।
অন্নাভাবে শীর্ণকায় বলহীন দেহ।
ক্ষুধা কষ্টে আত্মহত্যা করিতেছে কেহ।।
অতি প্রিয় প্রাণাধিক পুত্রকন্যাগণে ।
করিতেছে পরিত্যাগ অন্নের কারণে।।
বল বল বল দেবী কি পাপের ফলে।
ভীষণ দুর্ভিক্ষে সদা মর্ত্যবাসী জ্বলে।।
কমলা ব্যথিত হয়ে দুঃখিত অন্তরে।
কহিলেন অতঃপর ক্ষুণ্ন মুনিবরে।।
নর-নারী দুঃখ পায় শোকের বিষয়।
দুষ্কৃতির ফল ইহা জানিবে নিশ্চয়।।
চঞ্চলা আমার নাম কিসের লাগিয়া।
কারণ ইহার তবে শুন মন দিয়া।।
দিবা নিদ্রা অনাচার ক্রোধ অহঙ্কার।
আলস্য কলহ মিথ্যা ঘিরিছে সংসার।।
উচ্চ হাসি উচ্চ ভাষা কহে নারীগণ।
সন্ধ্যাকালে নিদ্রা যায় বেহোস নয়ন।।
দয়া মায়া লজ্জা আদি দিয়া বিসর্জ্জন।
যেথায় সেথায় করে স্বেচ্ছায় গমন ।।
না দেয় প্রদীপ তারা প্রতি সন্ধ্যাকালে।
ধূপধূনা দিতে লজ্জা মনে মনে গণে।।
প্রভাতেতে নাহি দেয় গোময়ের ছড়া।
ময়লায় নষ্ট পাছে হয় শাড়ী পড়া।।
লক্ষ্মী অংশে নারীজাতি করিয়া সৃজণ।
পাঠায়েছি মৰ্ত্তধামে সুখের কারণ।।
বৃথাই সুখেতে তারা ভুলিয়া আমায়।
অকার্য কুকার্য্য করি সময় কাটায়।।
শ্বশুর শাশুড়ীপ্রতি নহে ভক্তিমতি।
বাক্যবাণ বর্ষে সদা তাহাদের প্রতি।।
স্বামীর আত্মীয়গণে না করে আদর।
থাকিতে চাহেগো সদা হয়ে স্বতন্তর।।
লজ্জা আদি গুণ যত নারীর ভূষণ।
শরীর হইতে তারা করেছে বর্জ্জন।।
অতিথি দেখিলে তারা কষ্ট পায় মনে।
স্বামীর অগ্রেতে খায় যত নারীগণে।।
পতিরে করিছে হেলা না শুনে বচন।
ছাড়িয়াছে গৃহস্থলী ছেড়েছে রন্ধন।।
পুরুষের পরিহাসে কাটায় সময়।
মিথ্যা ছাড়া সত্য কথা কভু নাহি কয়।।
সতত তাহারা মোরে জ্বালাতন করে।
চপলার প্রায় তাই ফিরি দ্বারে দ্বারে।।
ঈর্ষা-দ্বেষ-হিংসা পূর্ণ মানব হৃদয় ।
পরশ্রীকাতর চিত্ত কুটিলতাময় ।।
দেব-দ্বিজে ভক্তিহীন তুচ্ছ গুরুজন।
সর্ব্বদা আপন সুখ করে অন্বেষণ।।
রসনা তৃপ্তির হেতু অভক্ষ ভক্ষণ।
তারি ফলে নানা ব্যাধি অকালে মরণ।।60
যেই গৃহ এইরূপ পাপের আগার।
অচলা হইয়া তথা থাকি কি প্রকার।।
বৰ্জ্জিয়া এসব দোষ হ'লে সদাচারী।
অচলা থাকিব সেথা দিবা বিভাবরী।।
এত শুনি মুনিবর কহে হৃষ্ট মনে।
কি হ'লে প্রসন্না দেবী হবে নরগণে।।
ওহে দয়াময়ি তুমি না করিলে দয়া।
পারে কি লভিতে নর তব পদ ছায়া।।
সৃষ্টি স্থিতি প্রলয়ের তুমি অধিশ্বরী।
জগত-প্রসূতি তুমি জগত ঈশ্বরী।।
কৃপা করি কর মাতঃ বিহিত বিধান।
পরের লাগিয়া কাঁদে সদা মোর প্রাণ।।
দেবর্ষির বাক্যে দয়া উপজিল মনে।
বিদায় করিল তারে মধুর ভাষণে।।
মর্ত্যবাসীদের দুঃখে কাঁদে মোর প্রাণ।
প্রতিকার চেষ্টা আমি করিব এখন।।
অতঃপর লক্ষ্মীদেবী ভাবে মনে মনে।
ভূলোকের দুঃখ নাশ করিব কেমনে।।
পূজিয়া শুনিবে কথা আনন্দিত মনে।।
বাড়িবে ঐশ্বৰ্য্য তাহে তোমার কৃপায়।
ভাবিয়া চিন্তিয়া বলে নারায়ণ প্রতি।
কিরূপে হরিব এবে নরের দুর্গতি।।
কেমনে তাদের দুঃখ করিব মোচন।
উপদেশ দাও মোরে বিপদভঞ্জন।।
শুনিয়া লক্ষ্মীর বাণী কহে লক্ষ্মীপতি।
উতলা কি হেতু দেবী স্থির কর মতি।।
মন দিয়া শুন সতী বচন আমার।
লক্ষ্মীব্রত নরলোকে করহ প্রচার।।
গুরুবারে সন্ধ্যাকালে মিলি এয়োগণে।
দারিদ্র্যতা দূরে যাবে তোমার দয়ায়।।
শ্রীহরির বাক্যে দেবী অতি হৃষ্ট মনে।
গমন করিল মৰ্ত্তে ব্রত প্রচারণে।।
অবন্তী নগরে গিয়া হয় উপনীত।
দেখিয়া শুনিয়া হ'ল বড়ই স্তম্ভিত।।
নগরের লক্ষপতি ধনেশ্বর রায়।
ঐশ্বর্য্য অপার তার কুবেরের প্রায়।।
সোনার সংসার তার শূন্য হিংসা দ্বেষ।
পালিত সে প্রজাগণে পুত্ৰ নিৰ্ব্বিশেষ।।
এক অন্নে সাত পুত্র রাখি ধনেশ্বর।
সসম্মানে যথাকালে গেলা লোকান্তর।। 100
ভার্য্যাদের কুহকেতে সপ্তসহোদর।
হইল পৃথক অন্ন কিছুদিন পর৷৷
হিংসা-দ্বেষ অলক্ষ্মীর যত সহচর।
একে একে সবে আসি প্রবেশিল ঘর।।
ক্রমে ক্রমে লক্ষ্মীদেবী ছাড়িল সবারে।
সোনার সংসার সব গেল ছারখারে।।
বৃদ্ধা ধনেশ্বর পত্নী নিজ ভাগ্যদোষে।
না পারে তিষ্ঠীতে তথা বধূদের রোষে।।
চলিল বনেতে বৃদ্ধা ত্যাজিতে জীবন।
অদৃষ্টের ফলে হয় এ হেন ঘটন।।
অন্নাভাবে শীর্ণ দেহ মলিন বদন।
চলিতে শকতি নাই করিছে ক্রন্দন।।
হেনকালে ছদ্মবেশে দেবী নারায়ণী।।
বন মধ্যে উপনীত হইলা আপনি৷৷
সকরুণ স্বরে দেবী জিজ্ঞাসে বৃদ্ধারে।
কি জন্য এসেছো তুমি এ ঘোর কান্তারে।।
কাহার তনয়া তুমি কাহার ঘরণী।
কি হেতু মলিন মুখ বিষাদ বদনী।।
বৃদ্ধা বলে অতিহীনা আমি অভাগিনী।
কি কাজ শুনিয়া মম দুঃখের কাহিনী।।
পিতা পতি ছিল মোর অতি ধনবান।
সদা ছিল মোর ভাগ্যে লক্ষ্মী অধিষ্ঠান৷৷
সোনার সংসার মোর ছিল ধনে জনে।
পুত্র-বধূগণ মোরে সেবিত যতনে।।
পতির হইলে কাল সুখ শান্তি যত।
গৃহ হ'তে ক্রমে ক্রমে হ'ল তিরোহিত।।
সাত পুত্র সাত হাড়ি হয়েছে এখন।
সতত বধুরা মোরে করে জ্বালাতন৷৷
সহিতে না পারি আর সংসার যাতনা।
ত্যজিব জীবন আমি করেছি বাসনা ।।
নারায়ণী বলে শুন আমার বচন।
আত্মহত্যা মহাপাপ নরকে গমন।।
যাও সতী গৃহে গিয়ে কর লক্ষ্মীব্রত।
অচিরে হইবে তব সুখ পূৰ্ব্ব মত।।
গুরুবারে সন্ধ্যাকালে মিলি নারীগণ।
করিবে লক্ষ্মীর ব্রত হরষিত মন।।
জলপূর্ণ ঘটে দিবে সিঁদুরের ফোঁটা।
আম্রের পল্লব দিবে শিরে এক গোটা।।
ধূপ দীপ জ্বালাইয়া রাখিবে ঘরেতে।
শুনিতে বসিবে কথা দুৰ্ব্বা লয়ে হাতে।।
মনেতে লক্ষ্মীর মূর্ত্তি করিয়া চিন্তন।
এক মনে ব্রতকথা করিবে শ্রবণ।।
কথা অন্তে উলু দিয়া প্রণাম করিবে।
তারপরে এয়োগণে সিন্দুর দানিবে ৷৷
যে রমণী পূজা করে প্রতি গুরুবারে।
হইবে বিশুদ্ধ মন মা লক্ষ্মীর বরে।।
যেই গৃহে ব্রতকালে সব বামাগণ।
সর্ব্ব কার্য্য পরিহরি ব্রতে দেয় মন ৷ ৷
সেই গৃহে বাঁধা রব হইয়া অচলা ।
ভক্তবাঞ্ছা পূর্ণ করি আমি যে কমলা।।
পৌণমাসী হয় যদি কোন লক্ষ্মীবারে।
উপবাসে থেকে নারী পূজিও আমারে।।
সকল বাসনা তব হইবে পূরণ।
পতি পুত্র লয়ে সুখে রবে অনুক্ষণ।।
লক্ষ্মীর ভাণ্ডার স্থাপি লও ঘরে ঘরে।
রাখিবে তণ্ডুল তাতে এক মুষ্টি ক'রে।।
সঞ্চয়ের পথ ইহা জানিবে সকলে।
দুঃসময়ে সুখী হবে তুমি এর ফলে।।
আলস্য ত্যজিয়া সূতা কাটি বামাগণ।
দেশের অবস্থা মনে করিয়া চিন্তন।।
প্রসন্ন থাকিবে তাহে কহিলাম সার।
যাও গৃহে কর গিয়া ব্রতের প্রচার।।
কর এবে ব্রত মোর সংসারে প্রচার।
অচিরে হইবে তব বৈভব অপার।।
পুত্রবধূগণ বশে থাকিবে তোমার।
পূৰ্ব্ব মত শান্তিপূর্ণ হইবে সংসার।।
বলিতে বলিতে দেবী নিজ মূর্ত্তি ধরি।
দরশন দিলা তারে লক্ষ্মী কৃপা করি।।
দেখিয়া হইলা বৃদ্ধা আনন্দে বিভোর।
প্রণাম করিছে বৃদ্ধা যুড়ি দুই কর।।
প্রসন্ন হইয়া দেবী দিল তারে কোল।
অর্ন্তদ্ধান হইলেন ব'লে হরিবোল।।
এত বলি লক্ষ্মীদেবী হ'ল অদৰ্শন।
হৃষ্টচিত্তে বৃদ্ধা গৃহে করিল গমন।।
যে রূপে ঘটিল তার দেবী দর্শন।
আসিয়া গৃহেতে সব করিল বর্ণন। ।।
ব্রতের বিধান বৃদ্ধা বলিল সবারে।
দেবী সব কথা যাহা বলিছে তাহারে।।
বধূগণ সবে মিলি করে লক্ষ্মীব্রত।
হিংসা-দ্বেষ স্বার্থ ভাব হ'ল তিরোহিত৷৷
মিলিল একত্রে পুনঃ ভাই সাতজন।
মিলে সহদরাসম যত বধূগণ।।
মা লক্ষ্মী করিল তথা পুনরাগমন।
গৃহ অচিরে হইল শান্তি নিকেতন।।
দৈবযোগে একদিন বৃদ্ধার আলয়ে।
উপনীত এক নারী ব্রতের সময়ে।।
ব্রতকথা শুনি তার ভক্তি উপজিল।
মনে মনে লক্ষ্মীব্রত মানস করিল।।
পতি তার চির রুগ্ন অক্ষম অর্জ্জনে।
ভিক্ষা করি যাহা পায় খায় দুই জনে।।
তাই নারী ভাবি মনে করিছে কামনা ৷
নিরোগ পতিরে করে চরণে বাসনা৷৷
গৃহে গিয়ে এয়ো লয়ে করে লক্ষ্মীব্রত।
ভক্তি মতে সাধ্বী নারী পূজে বিধিমত।।
দেবীর কৃপায় তার দুঃখ হল দূর।
পতি হ'ল সুস্থ্য দেহ ঐশ্বর্য্য প্রচুর।।
কালক্রমে শুভদিনে জন্মিল তনয়।
হইল সংসার তার সুখের আলয়।।
দয়াবতী নারায়ণী হইলা সদয়।
তনয় জন্মিল তার উজ্জ্বল আলয়।।
এইরূপে লক্ষ্মীব্রত হয় ঘরে ঘরে।
ক্রমে প্রচারিত হ'ল অবন্তী নগরে।।
অতঃপর শুন এক অপূর্ব্ব ব্যাপার ।
ব্রতের মাহাত্ম্য হ'ল যেভাবে প্রচার ।।
অবন্তী নগরে এক গৃহস্থ্য ভবনে।
বামাগণ নিয়োজিত ব্রতের সাধনে৷৷
শ্রীনগরবাসী এক বণিক তনয়।
উপনীত হ'ল আসি ব্রতের সময়।।
অনেক সম্পত্তি তার ভাই পঞ্চজন।
পরস্পর অনুগত ছিল সৰ্ব্বক্ষণ।।
সোনার সংসার সদা ছিল ধনে জনে।
বধূরা পরস্পরে সেবিত যতনে।।
ব্রত দেখি হেলা করি সাধুর তনয়।
বলে একি ব্রত, ইথে কিবা ফলোদয়।।
সদাগর বাক্য শুনি বলে বামাগণ।
করি লক্ষ্মীব্রত যাতে কামনা পূরণ।।
যে জন করিবে ইহা ধনে জনে তার।
লক্ষ্মীর বরেতে হবে পূর্ণিত সংসার।।
ইহা শুনি সদাগর বলে অহঙ্কারে।।
যে জন অভাবে থাকে সে পূজে ইহারে।।
ধন জন ভোগ যা কিছু সম্ভবে।
সকল আমার আছে আর কিবা হবে।।
কপালে না থাকে যদি লক্ষ্মী দিবে ধন।
হেন বাক্য আমি কভু না শুনি কখন।।
গৰ্ব্বিত বচন লক্ষ্মী সহিতে না পারে।
অহঙ্কার দোষে দেবী ছাড়িল তাহারে।।
ধন মদে মত্ত হয়ে লক্ষ্মী করে হেলা।
নানা দ্রব্যে পূর্ণতরী বাণিজ্যেতে গেলা।।
দৈব যোগে লক্ষ্মী-কোপে সহ ধনজন।
সপ্ততরী জল মাঝে হইল মগন।
সৰ্ব্বদ্ৰব্য যাহা কিছু আছিল তাহার।
বজ্রাঘাতে দগ্ধ হয়ে হ'ল ছারখার।।
দূরে গেল ভ্রাতৃ ভাব হ'ল পৃথগন্ন।
সোনার সংসারে তারা সকলে বিপন্ন।।
ভিক্ষাপাত্র হাতে লয়ে ফিরে দ্বারে দ্বারে।
জঠর জ্বালায় ঘোরে দেশ দেশান্তর।।
পড়িয়া বিপাকে তাই সাধুর তনয়।
অশ্রুঝরে দুই নেত্রে কান্দে উভরায়।।
কি দোষ পাইয়া বিধি করিলা এমন।
অধম সন্তান আমি অতি অভাজন।।
সাধুর দুদশা দেখি দয়া উপজিল।
করুণা হৃদয়া লক্ষ্মী সকলি বুঝিল।।
দুঃখ দূর তরে তারে করিয়া কৌশল।
পাঠায় অবন্তীপুরে করি ভিক্ষা ছল।।
নানা স্থানে ঘুরাইয়া আনিবার পর।
উপনীত হইলা মাতা অবন্তী নগর।।
লক্ষ্মীব্রত করে তথা সব বামাগণ।
স্মরণ হইল তার পূর্ব্ব বিবরণ।।
বুঝিল তখন কেন পড়িল বিপাকে।
অহঙ্কার দোষে দেবী ত্যজিল-তাহাকে।।
জোর করে ভক্তিভরে হয়ে এক মন।
করিলা তাঁহার স্তুতি সাধুর নন্দন।।
ক্ষমদেবী এ দাসের অপরাধ যত ।
তব পদে মতি যেন থাকে অবিরত।।
ক্ষমা কর নারায়ণি ওমা ক্ষমাশীলা।
সত্য স্বরূপিণী তুমি ওগো মা কমলা।।
শ্রেষ্ঠ হ'তে শ্রেষ্ঠতরা পরমা প্রকৃতি।
কোপাদি বর্জ্জিতা তুমি মূৰ্ত্তিমতী ধৃতি।।
সতী সাধ্বী রমণীর তুমিই উপমা।
দেবগণ ভক্তি মনে পূজে সদা তোমা।।
সুর নর সকলের সম্পদ রূপিণী।
জগত-সৰ্ব্বস্ব তুমি ঐশ্বৰ্য দায়িনী।।
রাস-অধিষ্ঠাত্রী দেবী তুমি রাসেশ্বরী।
সকলেই তব অংশ আছে যত নারী।।
গোলকে কমলা তুমি মাধব-মোহিনী।
ক্ষীরোদ সাগরে তুমি ক্ষীরোদ-নন্দিনী।।
স্বৰ্গলক্ষ্মী তুমি মাগো ত্রিদিব মণ্ডলে।
গৃহলক্ষ্মী রূপে তুমি বিরাজ ভূতলে।।
তুমিই তুলসী গঙ্গা পতিত পাবনী।
সাবিত্রী বিরিঞ্চিপুরে বেদের জননী।।
কৃষ্ণ প্রাণেশ্বরী তুমি কৃষ্ণ প্রাণাধিকা।
তুমিই আগমে ছিলে দ্বাপরে রাধিকা।।
বৃন্দাবন মাঝে তুমি বৃন্দা গোপনারী।
বৃন্দালয়ে ছিলে তুমি হয়ে গোপেশ্বরী।।
বিরাজ চম্পক বনে চম্পক ঈশ্বরী।
শতশৃঙ্গ শৈল তুমি শোভিতা সুন্দরী।।
বিকশিত পদ্মবনে তুমি পদ্মাবতী।
মালতী কুসুম কুঞ্জে তুমি মা মালতী।।
কুন্দদন্তী নাম ধর তুমি কুন্দবনে।
তুমি গো সুশীলা সতী কেতকী কাননে ।।
তুমি মা কদম্ব মালী কদম্ব কাননে।
বন অধিষ্ঠাত্রী দেবী তুমি বনে বনে।।
রাজলক্ষ্মী তুমি মাগো নরপতি পুরে।
সকলের গৃহলক্ষ্মী তুমি ঘরে ঘরে।।
দীন জনে রাজ্য পায় তব কৃপাবলে।
দয়া কর এবে মোরে ওগো মা কমলে।।
দয়াময়ী ক্ষেমঙ্করী অধম তারিণী।
অপরাধ ক্ষমা কর দুঃখ বিনাশিনী।।
অন্নদা বরদা মাতা বিপদ নাশিনী।
দয়া কর এবে মোরে মাধব ঘরণী।।
এইরূপে স্তব করি ভক্তিযুক্ত মনে।
একাগ্র হৃদয়ে সাধু ব্রতকথা শুনে।।
ব্রত অন্তে সদাগর করিয়া প্রণাম।
ব্রতের সঙ্কল্প করি আসে নিজধাম।।
বধূগনে বলে সাধু লক্ষ্মীব্রত সার।
সবে মিলে কর ইহা প্রতি গুরুবার ।।
সাধুর বাক্যেতে তুষ্ট হয়ে বন্ধুগণ।
ভক্তি চিত্তে করে তারা ব্রত আচরণ।
ভক্তাধীনা লক্ষ্মীদেবী হইয়া সদয়।
নাশিল সাধুর ছিল যত বিঘ্ন ভয়।।
দেবীর কৃপায় সাধু সম্পদ লভিল।
দারিদ্রতা দূরে গিয়া নিরাপদ হ'ল।।
সপ্ততরী উঠে ভাসি জলের উপর।
মহানন্দে পূর্ণ হ'য় সাধুর অন্তর।।
মিলিল ভ্রাতারা পুনঃ আর বধূগণ ।
সাধুর সংসার হ'ল পূর্ব্বের মতন।।
সবে মনে রেখ সদা লক্ষ্মীর বচন।
লক্ষ্মীব্রত নরলোকে কর প্রচলন।।
প্রতি গুরুবারে মিলি যত নারীগণ।
পূজিয়া শুনিবে কথা ভক্তিযুক্ত মন।।
এইরূপে মর্ত্যধামে ব্রতের প্রচার।
মনে রেখ মর্ত্যধামে লক্ষ্মীব্রত সার।।
এই ব্রত যে রমণী করে একমনে।
লক্ষ্মীর কৃপায় সেই বারে ধনেজনে।।
অপুত্রের পুত্র হয় নির্দ্ধনের ধন।
ইহলোকে সুখ অন্তে স্বর্গেতে গমন।।
যেবা পড়ে যেবা শুনে যেবা রাখে ঘরে।
লক্ষ্মীর বরেতে তার মনোবাঞ্ছা পুরে।।
ব্রত করি স্তব পাঠ যেই জন করে।
অভাব রহেনা তার মা লক্ষ্মীর বরে।।
লক্ষ্মীর ব্রতের কথা হ'ল সমাপন।
ভক্তিভরে বর লহ যাহা চায় মন।।
সিঁথিতে সিন্দুর দাও সব এয়ো মিলে।
হুলুধ্বনী দাও সবে অন্য কথা ভুলে।।
লক্ষ্মীর ব্রতের কথা বড় সুধাময় ।
প্রণাম করিয়া যাও যে যার আলয়।।
যোড় করি দুই হাত ভক্তিযুক্ত মনে।
প্রণাম করহ এবে যে থাক যেখানে৷৷
প্রণমামি লক্ষ্মীমাতা বিষ্ণুর ঘরণী।
ক্ষীরোদ সম্ভবা দেবী জগৎমোহিনী।।
দয়াময়ী জগন্মাতা বিপদ নাশিনী।
অগতির গতি মাতা তুমি নারায়ণী।
ভকত বৎসলা দেবী সত্য স্বরূপিণী।
হরিপ্রিয়ে পদ্মাসনা ভূভার হারিণী।।
ভবরাধ্যা তুমি মাতঃ শ্যাম আরাধিতা।
পদ্ম ছায়া দানে কৃপা কর জগন্মাতা।।
দুর্গতি সাগরে প'রে ডাকি তোমা আমি।
তরাও তারিণী মোরে চরণে নমামি।।
এত বলি গ্রন্থ আমি করি সমাপন।
ভূমিতে লুটিয়া প্রণাম কর সৰ্ব্বজন।
6:29
ভাবিয়া চিন্তিয়া বলে নারায়ণ প্রতি।
6:33
কিরূপে হরিব এবে নরের দুর্গতি।।
6:38
কেমনে তাদের দুঃখ করিব মোচন।
6:43
উপদেশ দাও মোরে বিপদভঞ্জন।।
6:48
শুনিয়া লক্ষ্মীর বাণী কহে লক্ষ্মীপতি।
6:53
উতলা কি হেতু দেবী স্থির কর মতি।।
6:58
মন দিয়া শুন সতী বচন আমার।
7:03
লক্ষ্মীব্রত নরলোকে করহ প্রচার।।
7:08
গুরুবারে সন্ধ্যাকালে মিলি এয়োগণে।
7:13
পূজিয়া শুনিবে কথা আনন্দিত মনে
7:17
বাড়িবে ঐশ্বর্য্য তাহে তোমার কৃপায়
7:22
দারিদ্র্যতা দূরে যাবে তোমার দয়ায়।।